advertisement

বিশ্ব যখন জাপানের বিরুদ্ধে, তখন ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একা দাঁড়িয়েছিলেন বাঙালি বিচারক রাধাবিনোদ পাল


কালের চাকা | প্রতিবেদক: কাজী আব্দুল আজিম (সুমন) প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৫৬ অপরাহ্ণ
বিশ্ব যখন জাপানের বিরুদ্ধে, তখন ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একা দাঁড়িয়েছিলেন বাঙালি বিচারক রাধাবিনোদ পাল

advertisement

বিশ্ব যখন জাপানের বিরুদ্ধে, তখন ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একা দাঁড়িয়েছিলেন বাঙালি বিচারক রাধাবিনোদ পাল
কাজী আব্দুল আজিম (সুমন), বিশেষ প্রতিনিধি


কুষ্টিয়ার সালিমপুরে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি বিচারকের ঐতিহাসিক ভিন্নমত আজও আলোচিত জাপানে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির পর ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মুহূর্তেই প্রাণ হারান বিপুলসংখ্যক মানুষ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় দুটি শহর। যুদ্ধের অবসান ঘটলেও জাপানের জন্য শুরু হয় আরেক অধ্যায়—যুদ্ধাপরাধের বিচার।

১৯৪৬ সালে টোকিওতে শুরু হয় আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট, যা ইতিহাসে ‘টোকিও ট্রায়াল’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিচার করতে বসেন ১১ দেশের ১১ জন বিচারক। কিন্তু সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় উঠে আসে ন্যায়বিচার, আন্তর্জাতিক আইন এবং বিজয়ী পক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এমন এক ঐতিহাসিক বিচারপ্রক্রিয়ায় বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন এক বাঙালি বিচারক। তাঁর নাম বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল।

১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার সালিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজ্ঞ। পরবর্তী সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

টোকিও ট্রায়ালে বিচারপতি পাল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হননি। তাঁর আপত্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি—কোনো অপরাধ সংঘটনের সময় যে আইন কার্যকর ছিল না, পরবর্তী সময়ে সেই আইন প্রয়োগ করে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় কি না। তাঁর মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনের পূর্বপ্রযোজ্যতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের নীতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, বিজয়ী শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ড ও তাদের দায়বদ্ধতা যখন বিচারপ্রক্রিয়ার আওতার বাইরে থাকে, তখন সেই বিচার কতটা নিরপেক্ষ হতে পারে।

প্রায় ১ হাজার ২৩৫ পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ ভিন্নমতপূর্ণ রায়ে বিচারপতি পাল ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত সব জাপানি নেতাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়ার পক্ষে মত দেন। তাঁর এই অবস্থান ছিল ট্রাইব্যুনালের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। উল্লেখ্য, অন্য বিচারকদের মধ্যেও ভিন্নমত ছিল; তবে সব অভিযুক্তকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়ার পক্ষে একমাত্র বিচারক ছিলেন রাধাবিনোদ পাল।

তাঁর রায়কে জাপানের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গা ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায্য প্রয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং বিজয়ী ও পরাজিত—উভয় পক্ষের জন্য একই মানদণ্ড নিশ্চিত করা।

বিচারপতি পালের এই ঐতিহাসিক ভিন্নমত আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে পরবর্তী সময়েও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তাঁর যুক্তি ও অবস্থান নিয়ে আজও গবেষণা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে।

জাপানেও তাঁর স্মৃতি বিশেষভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। টোকিওর ইয়াসুকুনি মন্দিরসহ জাপানের বিভিন্ন স্থানে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। দেশটির একাংশের মানুষের কাছে তিনি ন্যায়বিচার ও ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যে মানুষটি একসময় আন্তর্জাতিক বিচারমঞ্চে নিজের আইনগত অবস্থান তুলে ধরতে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর জন্মভূমি আজকের বাংলাদেশ। কুষ্টিয়ার সালিমপুরের সেই সন্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালির মেধা, সাহস ও বিচারবোধের এক উল্লেখযোগ্য পরিচয় হয়ে আছেন।

আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখনো সাধারণ মানুষের অজানা। বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল তাঁদেরই একজন। তাঁকে শুধু জাপানের প্রেক্ষাপটে নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থায় একজন বাঙালি আইনজ্ঞের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবেও স্মরণ করা প্রয়োজন।

কুষ্টিয়ার মাটি থেকে উঠে আসা এই বাঙালি বিচারপতির নাম তাই ইতিহাসে যথাযথ মর্যাদায় উচ্চারিত হওয়া উচিত—বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল।


advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর