লিঙ্গ পরিচয়ের সংকট পেরিয়ে কূটনীতির বিশ্বমঞ্চে, ওয়ালিদ ইসলামের ব্যতিক্রমী জীবনসংগ্রাম
কালের চাকা |
প্রতিবেদক:
কাজী আব্দুল আজিম (সুমন)
প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১:১৮ অপরাহ্ণ
লিঙ্গ পরিচয়ের সংকট পেরিয়ে কূটনীতির বিশ্বমঞ্চে, ওয়ালিদ ইসলামের ব্যতিক্রমী জীবনসংগ্রাম
কাজী আব্দুল আজিম (সুমন), বিশেষ প্রতিনিধি
জীবনের প্রতিকূলতা, সামাজিক বৈষম্য, পরিচয় সংকট ও নানা অপমানের মধ্যেও নিজের মেধা, যোগ্যতা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে অনন্য অবস্থানে পৌঁছেছেন বাংলাদেশের কূটনীতিক ওয়ালিদ ইসলাম। শৈশবের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়া এই মানুষটির জীবনগল্প কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; বরং পরিবার, বিশেষ করে মায়ের ভালোবাসা, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে ভাবনারও একটি উপলক্ষ।
বর্তমানে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে কাউন্সেলর (পলিটিক্যাল-১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওয়ালিদ ইসলাম।
এর আগে তেহরানের জর্ডান এলাকায় তাঁর ছোট্ট বাসাটি ছিলো যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। দেয়ালে হাতে আঁকা জলরঙের ছবি, ঘরের এক কোণে শিকা, তাকজুড়ে নকশিকাঁথার টুকরো। পাশাপাশি রয়েছে মালয়েশিয়ার কাঠের পুতুল, জাপানের সিরামিকসহ বিভিন্ন দেশের স্মৃতিচিহ্ন। বিদেশের মাটিতে থেকেও নিজের শিকড় ও সংস্কৃতিকে আগলে রেখেছেন তিনি।
এই মানুষটিই ওয়ালিদ ইসলাম। পেশাগত পরিচয়ে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। কর্মস্থলে তাঁর পরিচয় ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে।
তবে তাঁর এই পরিচয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়ের সংকট, সামাজিক প্রতিকূলতা এবং নিজের অস্তিত্বকে আড়াল করে বেঁচে থাকার এক কঠিন অভিজ্ঞতা।
২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি। তেহরানের শীতের রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি আবেগঘন পোস্ট প্রকাশ করেন ওয়ালিদ ইসলাম। দীর্ঘ ৩৪ বছর নিজের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আড়াল করে রাখার পর সেদিন প্রকাশ্যে নিজের আত্মপরিচয়ের কথা জানান তিনি।
নিজের পোস্টে তিনি নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের ক্যাডার কর্মকর্তা এবং বিশ্বের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের কূটনীতিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকে তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করেন, আবার কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্যও করেন।
পরবর্তীতে প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নিজের পরিচয়সংকটের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে নিজের পরিচয় গোপন রেখে চলা এবং মানুষের নানা প্রশ্ন ও মন্তব্যের মুখোমুখি হওয়া তাঁর জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।
ওয়ালিদ ইসলামের শৈশব কেটেছে গোপালগঞ্জের একটি দরিদ্র পরিবারে। আট ভাইবোনের সংসারে তাঁর বাবা ট্রাক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অভাব-অনটনের মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন মা আমিনা বেগম।
শৈশব থেকেই তাঁর আচরণ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে এলাকার কিছু মানুষের মধ্যে ভিন্ন ধারণা তৈরি হয়। পরিবারের দেওয়া তথ্য ও তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ছোটবেলায় স্থানীয় হিজড়া সম্প্রদায়ের কয়েকজন তাঁকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইতেন। এমন পরিস্থিতিতে ভয় পেয়ে কাঁদতেন তিনি।
প্রতিবারই বাবা-মা তাঁকে আগলে রাখতেন। এমনকি একাধিকবার মা নিজের সোনার চুড়ি খুলে দিয়ে সন্তানকে নিজের কাছে রাখার চেষ্টা করেছেন বলে জানা যায়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিবার তাঁকে নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে উদ্যোগী হয়। ভালো স্কুলে ভর্তি করানো হয়। যাতায়াতের জন্য স্কুলবাসের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে রাস্তাঘাটে তাঁকে হয়রানির শিকার হতে না হয়। একপর্যায়ে পুরো পরিবার গোপালগঞ্জ ছেড়ে যশোরে চলে যায়।
যশোরে পড়াশোনার পাশাপাশি ইংরেজি, বিতর্ক, গান ও ছবি আঁকায় দক্ষতা অর্জন করেন ওয়ালিদ। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছেও তিনি ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী।
তবে বাইরে যতই স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন না কেন, নিজের পরিচয় নিয়ে ভেতরে ভেতরে নানা প্রশ্ন ও সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।
শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতায় উচ্চমাধ্যমিক শেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হন ওয়ালিদ ইসলাম। সেখান থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন।
প্রথমবার প্রত্যাশিত ক্যাডার না পেলেও হাল ছাড়েননি। পরবর্তী সময়ে ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন তিনি।
এ অর্জন তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যে শিশুকে একসময় সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে পরিবারকে বিশেষভাবে আগলে রাখতে হয়েছিল, সেই মানুষটিই পরবর্তী সময়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব পান।
কর্মজীবনে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতের মতো দেশে কাজ ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ইরানের তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করেন।
পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করলেও ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের বৈষম্য এবং অপমানের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ওয়ালিদ।
তাঁর প্রকাশিত বক্তব্যে উঠে এসেছে, কর্মক্ষেত্র ও প্রশিক্ষণকালেও তাঁর হাঁটাচলা, কথা বলার ধরন এবং ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ও উপহাসের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এমনকি ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্কেও তাঁর পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভুল ব্যাখ্যা ও কটূক্তির শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে বেদনাদায়ক অধ্যায়। ভালোবাসার একজন মানুষের সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথাবার্তা এগিয়েছিল। সেই সম্পর্ককে ঘিরে নিজের শারীরিক পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একাধিক বড় অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘ শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায়নি।
এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর জীবনে শারীরিক ও মানসিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
জীবনের এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ওয়ালিদ ইসলামের কাছে সবচেয়ে বড় আশ্রয় তাঁর পরিবার। বিশেষ করে মা আমিনা বেগমের ভালোবাসা ও সমর্থন তাঁর জীবনের অন্যতম শক্তি।
মাকে নিয়ে আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, তাঁর মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা। তাঁর ঘরে জন্ম না হলে হয়তো জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।
মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, বাবার দায়িত্ববোধ এবং পরিবারের সহযোগিতা তাঁকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
আজও দূর প্রবাসে থাকা ছেলের খোঁজ নেন মা। ফোনে ছেলেকে সাবধানে চলাফেরা করার পরামর্শ দেন। দূরত্ব থাকলেও মা-সন্তানের সেই ভালোবাসার বন্ধন অটুট রয়েছে।
তেহরানে নিজের বাসাটিকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোট্ট সংগ্রহশালায় পরিণত করেছেন ওয়ালিদ ইসলাম। বিদেশি অতিথিদের সামনে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরেন তিনি।
নিজের পরিচয় প্রকাশের পর আগের তুলনায় মানসিকভাবে স্বস্তি অনুভব করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর জীবনকাহিনি আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—একজন মানুষের যোগ্যতা কি তাঁর লিঙ্গপরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হবে? সামাজিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অবহেলা বা অপমান করা কতটা মানবিক? একজন মানুষের মেধা, শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও অবদানকে কি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
ওয়ালিদ ইসলামের জীবনসংগ্রাম মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাঁর মানবিকতা, যোগ্যতা, কর্মনিষ্ঠা ও অবদান।
প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার এই গল্প শুধু একজন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এটি একজন মায়ের ভালোবাসা, পরিবারের দায়িত্ববোধ এবং আত্মপরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার সাহসের গল্প।